১০ মাস ধরে বেতনহীন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ২৭ টিকা বহনকারী: ঋণের দায়ে বিপর্যস্ত পরিবার

১০ মাস ধরে বেতনহীন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ২৭ টিকা বহনকারী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনে কর্মরত টিকা বহনকারী (পোর্টার) ২৭ জন কর্মী গত ১০ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে ধারদেনায় চলছে তাঁদের সংসার। একদিকে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন, অন্যদিকে পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের।


ভুক্তভোগী টিকা বহনকারী নাহিদ মিয়া জানান, ছয় সদস্যের সংসার তাঁর। বৃদ্ধ মা-বাবা, স্ত্রী ও দুই সন্তানের ভরণপোষণ চলে তাঁর বেতনের টাকায়। কিন্তু ১০ মাস ধরে বেতন বন্ধ থাকায় তিনি এখন প্রায় ৭০ হাজার টাকা ঋণী। নাহিদ বলেন, 'নিয়মিত কেন্দ্রে টিকা পৌঁছে দিচ্ছি, কিন্তু বেতন পাচ্ছি না। মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করে কোনোমতে টিকে আছি। সন্তানের পড়ালেখাও অনিশ্চয়তার মুখে।'


শুধু নাহিদ নন, জেলার নয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অধীনে কর্মরত ২৭ জন পোর্টারের অবস্থাই অভিন্ন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ১৫ থেকে ২৫ বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাদের আক্ষেপ, জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের সাথে যুক্ত থেকেও তাঁদের প্রাপ্য সাম্মানিক থেকে দীর্ঘ সময় বঞ্চিত রাখা হয়েছে।


ব্রাহ্মণবাড়িয়া পোর্টার সমিতির সভাপতি শামীম মিয়া বলেন, 'দোকানে বাকি করে চলছে সংসার। সামাজিক ও পারিবারিকভাবে আমরা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি। সন্তানের ছোটখাটো আবদার মেটানোর মতো অবস্থাতেও নেই আমরা।'


পোর্টারদের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এবং ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত—মোট ১০ মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। বকেয়া বেতনের দাবিতে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি তাঁরা জেলা সিভিল সার্জনের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন।


জনগুরুত্বপূর্ণ এই টিকাদান কর্মসূচিতে পোর্টারদের ভূমিকা অপরিসীম। ১৯৯৫ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে পোলিও, হেপাটাইটিস বি, এমআর, হাম, পিসিভি ও আইপিভিসহ ১০ ধরনের টিকা শিশুদের কাছে পৌঁছাতে মাঠপর্যায়ে নিরলস কাজ করছেন তাঁরা।


এই বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন ডা. নোমান মিয়া বলেন, 'পোর্টাররা আগে কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ার ও পরে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রকল্পের অধীনে কাজ করেছিলেন। প্রকল্পটি দুই বছরের বেশি সময় আগে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা বিকল্প উৎস থেকে তাঁদের বেতন দেওয়ার চেষ্টা করেছি। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছে। অর্থ বরাদ্দ পাওয়া মাত্রই বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হবে।'


দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া বেতন না পাওয়ায় কর্মীরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। দ্রুত সময়ের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ করে তাঁদের মানবেতর জীবন থেকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

Previous Post Next Post
Advertisement